দ ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র—প্রতিদিন সকাল থেকেই এখানে ভিড় করেন আশপাশের চরাঞ্চলের নারী ও শিশুরা। কেউ আসেন গর্ভকালীন পরীক্ষা করাতে, কেউ চিকিৎসা কিংবা বিনা মূল্যের ওষুধের আশায়। কিন্তু অধিকাংশ দিনই তাদের চোখে পড়ে তালাবদ্ধ প্রধান ফটক ও নীরব ভবন। চিকিৎসক তো দূরের কথা, কোনো সেবাকর্মীর উপস্থিতিও থাকে না।
একই চিত্র দেখা যায় বহেরাতলা দক্ষিণ ইউনিয়নের হাজী আবুল কাশেম উকিল মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রেও। স্থানীয়দের অভিযোগ, ২৪ ঘণ্টা সেবা চালুর কথা থাকলেও বাস্তবে সপ্তাহের অধিকাংশ সময়ই কেন্দ্রগুলো বন্ধ থাকে। ফলে জরুরি মুহূর্তে চিকিৎসা না পেয়ে রোগীদের ছুটতে হয় উপজেলা সদর কিংবা জেলা শহরের হাসপাতালে। চরাঞ্চলের মানুষের জন্য যা সময়সাপেক্ষ, ব্যয়বহুল এবং অনেক ক্ষেত্রে প্রাণঘাতী ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ২০১৯ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে শিবচরের বিভিন্ন ইউনিয়নে প্রায় ১৫ কোটিরও বেশি টাকা ব্যয়ে তিনটি ১০ শয্যার মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে। পাশাপাশি শিরুয়াইল ইউনিয়নে আরও একটি হাসপাতাল নির্মাণাধীন রয়েছে। তবে অবকাঠামো নির্মাণ শেষ হলেও প্রয়োজনীয় জনবল ও চিকিৎসা সরঞ্জাম না থাকায় এসব কেন্দ্র থেকে কাঙ্ক্ষিত স্বাস্থ্যসেবা মিলছে না।
উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয় সূত্র জানায়, প্রতিটি মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রে চিকিৎসকসহ মোট ১০টি অনুমোদিত পদ থাকার কথা থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে অধিকাংশ পদ শূন্য রয়েছে। জনবল সংকটের কারণে নিয়মিত সেবা কার্যক্রম চালু রাখা সম্ভব হচ্ছে না। আপাতত অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে উপসহকারী কমিউনিটি চিকিৎসা কর্মকর্তাদের দিয়ে সপ্তাহে এক বা দুই দিন সীমিত আকারে সেবা দেওয়া হচ্ছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল।
ভুক্তভোগী নারীদের কণ্ঠে ক্ষোভ আর অসহায়ত্ব স্পষ্ট। চরাঞ্চলের বাসিন্দা রহিমা বেগম বলেন,
“অনেক দূর থেকে এসে দেখি তালা ঝুলছে। মাঝে মধ্যে খোলা থাকলে চিকিৎসা পাই, না হলে ফিরে যেতে হয়।
আরেক রোগী হামিদা খাতুন বলেন,
জরুরি অবস্থায় ডাক্তার না পেয়ে খালি হাতে ফিরে যাওয়ার কষ্ট ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।
স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক আবদুল কাদের জানান,
মা ও শিশুদের জন্য হাসপাতাল তৈরি করা হয়েছে—এটা প্রশংসনীয়। কিন্তু সেখানে যদি ডাক্তার ও ওষুধই না থাকে, তাহলে এই ভবন মানুষের কোনো কাজে আসে না। দ্রুত জনবল নিয়োগ না হলে সাধারণ মানুষই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
এ বিষয়ে মাদারীপুর জেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ডা. সাইফুল ইসলাম বলেন,
“চিকিৎসক ও জনবল সংকটের কারণে নিয়মিত সেবা দেওয়া যাচ্ছে না। নতুন নিয়োগ হলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে আমরা আশাবাদী।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল অবকাঠামো নির্মাণ করলেই স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন সম্ভব নয়। প্রয়োজন দক্ষ জনবল, পর্যাপ্ত ওষুধ সরবরাহ এবং কার্যকর ব্যবস্থাপনা। এসব নিশ্চিত করা না গেলে শিবচরের মা ও শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বাড়বে। দ্রুত পদক্ষেপ না নেওয়া হলে কোটি টাকার এসব স্বাস্থ্যকেন্দ্র কেবল নামফলকসমৃদ্ধ ইট-পাথরের ভবন হয়েই দাঁড়িয়ে থাকবে—সেবাবঞ্চিত মানুষের দীর্ঘ অপেক্ষার নীরব সাক্ষী হয়ে।










