Dhaka ০২:৩১ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬, ৩ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনামঃ

বাংলাদেশের শক্তি নিরাপত্তাঃ নবায়নযোগ্য শক্তিই কৌশলগত সমাধান

*মোস্তফা আল মাহমুদ*

মানব সভ্যতার ইতিহাসে শক্তি সবসময় উন্নয়নের কেন্দ্রে অবস্থান করেছে। শিল্প বিপ্লব থেকে শুরু করে আধুনিক ডিজিটাল অর্থনীতি—প্রতিটি ধাপেই জ্বালানি নিরাপত্তা একটি দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির অন্যতম ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে। সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অনিশ্চয়তা আবারও প্রমাণ করেছে যে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা কতটা ভঙ্গুর হতে পারে।

বাংলাদেশের মতো দ্রুত উন্নয়নশীল অর্থনীতির জন্য এই বাস্তবতা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দেশের জ্বালানি ব্যবস্থার বড় অংশ এখনও আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। ফলে বৈশ্বিক বাজারে মূল্য বৃদ্ধি বা সরবরাহ বিঘ্নিত হলে তা সরাসরি দেশের অর্থনীতি, শিল্প উৎপাদন এবং জ্বালানি নিরাপত্তাকে প্রভাবিত করে।

বাংলাদেশের জ্বালানি কাঠামোর কেন্দ্রে রয়েছে প্রাকৃতিক গ্যাস। দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প এবং গৃহস্থালির প্রধান জ্বালানি হিসেবে গ্যাস ব্যবহৃত হয়ে আসছে। কিন্তু গত এক দশকে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। বর্তমানে জাতীয় গ্যাসের চাহিদা প্রায় *৩,৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট প্রতিদিন (MMCFD)* হলেও সরবরাহ রয়েছে মাত্র *প্রায় ২,৫০০–২,৬০০ MMCFD*। ফলে প্রতিদিনই একটি বড় ঘাটতি তৈরি হচ্ছে।

এই ঘাটতি পূরণের জন্য বাংলাদেশ ২০১৮ সাল থেকে *তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (LNG)* আমদানি শুরু করে। বর্তমানে দেশে দুটি *Floating Storage and Regasification Unit (FSRU)* পরিচালিত হচ্ছে, যেগুলোর সম্মিলিত রিগ্যাসিফিকেশন সক্ষমতা প্রায় *১,১০০ MMCFD*। কিন্তু এই সক্ষমতাও দ্রুত পূর্ণ হয়ে যাচ্ছে, এবং ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে নতুন অবকাঠামোর প্রয়োজন দেখা দিচ্ছে।

আরও পড়ুনঃ  বীরগঞ্জে মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযানে গ্রেপ্তার ৪ জনের কারাদণ্ড

এদিকে LNG আমদানির জন্য বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করতে হচ্ছে। বিশ্ববাজারে LNG-এর দাম অত্যন্ত অস্থির হওয়ায় বাংলাদেশ প্রায়ই মূল্য ঝুঁকির মুখে পড়ে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক বাজারে LNG-এর মূল্যবৃদ্ধি দেশের জ্বালানি আমদানি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে। এতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।

কয়লা-ভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রেও একই ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। দেশের বেশিরভাগ কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র আমদানিকৃত কয়লার ওপর নির্ভরশীল। যদিও বাংলাদেশে কয়েকটি কয়লা খনি রয়েছে, কিন্তু প্রযুক্তিগত ও নীতিগত জটিলতার কারণে দেশীয় কয়লার ব্যবহার এখনও সীমিত।

এই বাস্তবতা স্পষ্টভাবে দেখায় যে দীর্ঘমেয়াদে শুধুমাত্র আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর নির্ভর করে বাংলাদেশের শক্তি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। তাই একটি বহুমুখী এবং কৌশলগত জ্বালানি নীতি প্রয়োজন।

প্রথমত, দেশীয় জ্বালানি সম্পদের উন্নয়নে নতুন করে জোর দিতে হবে। বিশেষ করে *বঙ্গোপসাগরের অফশোর এলাকায় তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান* কার্যক্রম দ্রুত সম্প্রসারণ করা জরুরি। একই সঙ্গে বিদ্যমান গ্যাসক্ষেত্রগুলোতে আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

দ্বিতীয়ত, LNG আমদানির অবকাঠামো আরও শক্তিশালী করতে হবে। বর্তমান FSRU-নির্ভর ব্যবস্থার পাশাপাশি *ভূমিভিত্তিক LNG টার্মিনাল*, পাইপলাইন সম্প্রসারণ এবং গ্যাস সংরক্ষণ সুবিধা উন্নয়ন করা হলে সরবরাহ নিরাপত্তা বাড়বে।

আরও পড়ুনঃ  সিসিটিভি ফুটেজে খুনিরা চিহ্নিত হলেও অধরা, মামলা হয়নি ২ দিনেও।

তৃতীয়ত, জ্বালানি উৎসের বৈচিত্র্য বৃদ্ধি করা জরুরি। গ্যাস, কয়লা, নবায়নযোগ্য শক্তি এবং আঞ্চলিক বিদ্যুৎ বাণিজ্যের মধ্যে একটি ভারসাম্যপূর্ণ জ্বালানি মিশ্রণ গড়ে তুলতে হবে।

এই প্রেক্ষাপটে নবায়নযোগ্য শক্তি বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সুযোগ তৈরি করতে পারে। ভৌগোলিক অবস্থান এবং প্রাকৃতিক সম্পদের দিক থেকে বাংলাদেশ সৌরশক্তি ব্যবহারের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। দেশে প্রতিদিন গড়ে *৪–৫ kWh প্রতি বর্গমিটার সৌর বিকিরণ* পাওয়া যায়, যা সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য যথেষ্ট সম্ভাবনাময়।

সঠিক নীতি এবং প্রণোদনার মাধ্যমে শিল্প, বাণিজ্যিক এবং আবাসিক ভবনের ছাদ ব্যবহার করে কয়েক হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। বিভিন্ন গবেষণা অনুযায়ী, শুধু ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প থেকেই *৩,০০০ থেকে ৪,০০০ মেগাওয়াট* বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে।

এক্ষেত্রে কিছু গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। যেমন—সৌর সরঞ্জামের ওপর শূন্য আমদানি শুল্ক, দ্রুত অনুমোদন প্রক্রিয়া, সরকারি অকৃষি জমিতে ইউটিলিটি-স্কেল সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপন, এবং বড় প্রকল্পের জন্য প্রতিযোগিতামূলক বিডিং ব্যবস্থা চালু করা।

আরও পড়ুনঃ  মা-মেয়েকে নৃশংস হত্যা: প্রধান আসামি রিমন পটিয়ায় গ্রেফতার।

এছাড়া কৃষি খাতে নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বাড়ানোরও বড় সুযোগ রয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় *১৫ লাখ ডিজেলচালিত সেচ পাম্প* ব্যবহৃত হচ্ছে। এগুলোকে ধীরে ধীরে সৌরচালিত সেচ ব্যবস্থায় রূপান্তর করা গেলে বিপুল পরিমাণ ডিজেল সাশ্রয় হবে এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ কমবে।

নবায়নযোগ্য শক্তির সম্প্রসারণের জন্য বিদ্যুৎ গ্রিডের আধুনিকায়নও অপরিহার্য। *ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেম (BESS)* এবং স্মার্ট গ্রিড প্রযুক্তি নবায়নযোগ্য শক্তির অনিয়মিত উৎপাদনকে স্থিতিশীল করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

সবশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের শক্তি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত কৌশল অপরিহার্য। দেশীয় জ্বালানি সম্পদের উন্নয়ন, LNG অবকাঠামোর শক্তিশালীকরণ এবং নবায়নযোগ্য শক্তির দ্রুত সম্প্রসারণ—এই তিনটি স্তম্ভের ওপর ভিত্তি করেই একটি টেকসই জ্বালানি ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা সম্ভব।

সঠিক নীতি, শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি এবং কৌশলগত বিনিয়োগের মাধ্যমে বাংলাদেশ তার জ্বালানি খাতকে রূপান্তর করতে পারে। তখন বাংলাদেশ শুধু নিজের শক্তি নিরাপত্তা নিশ্চিত করেই থেমে থাকবে না, বরং দক্ষিণ এশিয়ায় একটি সফল পরিষ্কার জ্বালানি রূপান্তরের আঞ্চলিক উদাহরণ হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত হতে পারবে।

*লেখক:*
মোস্তফা আল মাহমুদ
সভাপতি, BSREA

খাল পুনঃখনন কাজ পরিদর্শনে জেলা প্রশাসক

বাংলাদেশের শক্তি নিরাপত্তাঃ নবায়নযোগ্য শক্তিই কৌশলগত সমাধান

আপডেটের সময়: ০২:২১:২৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ৮ মার্চ ২০২৬

*মোস্তফা আল মাহমুদ*

মানব সভ্যতার ইতিহাসে শক্তি সবসময় উন্নয়নের কেন্দ্রে অবস্থান করেছে। শিল্প বিপ্লব থেকে শুরু করে আধুনিক ডিজিটাল অর্থনীতি—প্রতিটি ধাপেই জ্বালানি নিরাপত্তা একটি দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির অন্যতম ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে। সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অনিশ্চয়তা আবারও প্রমাণ করেছে যে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা কতটা ভঙ্গুর হতে পারে।

বাংলাদেশের মতো দ্রুত উন্নয়নশীল অর্থনীতির জন্য এই বাস্তবতা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দেশের জ্বালানি ব্যবস্থার বড় অংশ এখনও আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। ফলে বৈশ্বিক বাজারে মূল্য বৃদ্ধি বা সরবরাহ বিঘ্নিত হলে তা সরাসরি দেশের অর্থনীতি, শিল্প উৎপাদন এবং জ্বালানি নিরাপত্তাকে প্রভাবিত করে।

বাংলাদেশের জ্বালানি কাঠামোর কেন্দ্রে রয়েছে প্রাকৃতিক গ্যাস। দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প এবং গৃহস্থালির প্রধান জ্বালানি হিসেবে গ্যাস ব্যবহৃত হয়ে আসছে। কিন্তু গত এক দশকে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। বর্তমানে জাতীয় গ্যাসের চাহিদা প্রায় *৩,৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট প্রতিদিন (MMCFD)* হলেও সরবরাহ রয়েছে মাত্র *প্রায় ২,৫০০–২,৬০০ MMCFD*। ফলে প্রতিদিনই একটি বড় ঘাটতি তৈরি হচ্ছে।

এই ঘাটতি পূরণের জন্য বাংলাদেশ ২০১৮ সাল থেকে *তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (LNG)* আমদানি শুরু করে। বর্তমানে দেশে দুটি *Floating Storage and Regasification Unit (FSRU)* পরিচালিত হচ্ছে, যেগুলোর সম্মিলিত রিগ্যাসিফিকেশন সক্ষমতা প্রায় *১,১০০ MMCFD*। কিন্তু এই সক্ষমতাও দ্রুত পূর্ণ হয়ে যাচ্ছে, এবং ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে নতুন অবকাঠামোর প্রয়োজন দেখা দিচ্ছে।

আরও পড়ুনঃ  সিসিটিভি ফুটেজে খুনিরা চিহ্নিত হলেও অধরা, মামলা হয়নি ২ দিনেও।

এদিকে LNG আমদানির জন্য বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করতে হচ্ছে। বিশ্ববাজারে LNG-এর দাম অত্যন্ত অস্থির হওয়ায় বাংলাদেশ প্রায়ই মূল্য ঝুঁকির মুখে পড়ে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক বাজারে LNG-এর মূল্যবৃদ্ধি দেশের জ্বালানি আমদানি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে। এতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।

কয়লা-ভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রেও একই ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। দেশের বেশিরভাগ কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র আমদানিকৃত কয়লার ওপর নির্ভরশীল। যদিও বাংলাদেশে কয়েকটি কয়লা খনি রয়েছে, কিন্তু প্রযুক্তিগত ও নীতিগত জটিলতার কারণে দেশীয় কয়লার ব্যবহার এখনও সীমিত।

এই বাস্তবতা স্পষ্টভাবে দেখায় যে দীর্ঘমেয়াদে শুধুমাত্র আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর নির্ভর করে বাংলাদেশের শক্তি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। তাই একটি বহুমুখী এবং কৌশলগত জ্বালানি নীতি প্রয়োজন।

প্রথমত, দেশীয় জ্বালানি সম্পদের উন্নয়নে নতুন করে জোর দিতে হবে। বিশেষ করে *বঙ্গোপসাগরের অফশোর এলাকায় তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান* কার্যক্রম দ্রুত সম্প্রসারণ করা জরুরি। একই সঙ্গে বিদ্যমান গ্যাসক্ষেত্রগুলোতে আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

দ্বিতীয়ত, LNG আমদানির অবকাঠামো আরও শক্তিশালী করতে হবে। বর্তমান FSRU-নির্ভর ব্যবস্থার পাশাপাশি *ভূমিভিত্তিক LNG টার্মিনাল*, পাইপলাইন সম্প্রসারণ এবং গ্যাস সংরক্ষণ সুবিধা উন্নয়ন করা হলে সরবরাহ নিরাপত্তা বাড়বে।

আরও পড়ুনঃ  কালিগঞ্জে ভুয়া ডাক্তারকে ৬ মাসের কারাদণ্ড

তৃতীয়ত, জ্বালানি উৎসের বৈচিত্র্য বৃদ্ধি করা জরুরি। গ্যাস, কয়লা, নবায়নযোগ্য শক্তি এবং আঞ্চলিক বিদ্যুৎ বাণিজ্যের মধ্যে একটি ভারসাম্যপূর্ণ জ্বালানি মিশ্রণ গড়ে তুলতে হবে।

এই প্রেক্ষাপটে নবায়নযোগ্য শক্তি বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সুযোগ তৈরি করতে পারে। ভৌগোলিক অবস্থান এবং প্রাকৃতিক সম্পদের দিক থেকে বাংলাদেশ সৌরশক্তি ব্যবহারের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। দেশে প্রতিদিন গড়ে *৪–৫ kWh প্রতি বর্গমিটার সৌর বিকিরণ* পাওয়া যায়, যা সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য যথেষ্ট সম্ভাবনাময়।

সঠিক নীতি এবং প্রণোদনার মাধ্যমে শিল্প, বাণিজ্যিক এবং আবাসিক ভবনের ছাদ ব্যবহার করে কয়েক হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। বিভিন্ন গবেষণা অনুযায়ী, শুধু ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প থেকেই *৩,০০০ থেকে ৪,০০০ মেগাওয়াট* বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে।

এক্ষেত্রে কিছু গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। যেমন—সৌর সরঞ্জামের ওপর শূন্য আমদানি শুল্ক, দ্রুত অনুমোদন প্রক্রিয়া, সরকারি অকৃষি জমিতে ইউটিলিটি-স্কেল সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপন, এবং বড় প্রকল্পের জন্য প্রতিযোগিতামূলক বিডিং ব্যবস্থা চালু করা।

আরও পড়ুনঃ  মা-মেয়েকে নৃশংস হত্যা: প্রধান আসামি রিমন পটিয়ায় গ্রেফতার।

এছাড়া কৃষি খাতে নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বাড়ানোরও বড় সুযোগ রয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় *১৫ লাখ ডিজেলচালিত সেচ পাম্প* ব্যবহৃত হচ্ছে। এগুলোকে ধীরে ধীরে সৌরচালিত সেচ ব্যবস্থায় রূপান্তর করা গেলে বিপুল পরিমাণ ডিজেল সাশ্রয় হবে এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ কমবে।

নবায়নযোগ্য শক্তির সম্প্রসারণের জন্য বিদ্যুৎ গ্রিডের আধুনিকায়নও অপরিহার্য। *ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেম (BESS)* এবং স্মার্ট গ্রিড প্রযুক্তি নবায়নযোগ্য শক্তির অনিয়মিত উৎপাদনকে স্থিতিশীল করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

সবশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের শক্তি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত কৌশল অপরিহার্য। দেশীয় জ্বালানি সম্পদের উন্নয়ন, LNG অবকাঠামোর শক্তিশালীকরণ এবং নবায়নযোগ্য শক্তির দ্রুত সম্প্রসারণ—এই তিনটি স্তম্ভের ওপর ভিত্তি করেই একটি টেকসই জ্বালানি ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা সম্ভব।

সঠিক নীতি, শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি এবং কৌশলগত বিনিয়োগের মাধ্যমে বাংলাদেশ তার জ্বালানি খাতকে রূপান্তর করতে পারে। তখন বাংলাদেশ শুধু নিজের শক্তি নিরাপত্তা নিশ্চিত করেই থেমে থাকবে না, বরং দক্ষিণ এশিয়ায় একটি সফল পরিষ্কার জ্বালানি রূপান্তরের আঞ্চলিক উদাহরণ হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত হতে পারবে।

*লেখক:*
মোস্তফা আল মাহমুদ
সভাপতি, BSREA