সাতক্ষীরায় স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতার প্রেম প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় ব্লাকমেইল, কুৎসা ও চাঁদাবাজির বিষাক্ত নেটওয়ার্কে নারীর চরিত্র হনন
সরকারি দপ্তরের স্বাভাবিক পরিবেশ বিনষ্ট, একজন পেশাদার নারী কর্মকর্তাকে প্রকাশ্যে হেনস্তা এবং ব্লাকমেইল করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার এক নজিরবিহীন ও জঘন্য ঘটনার উন্মোচন হয়েছে সাতক্ষীরায়। জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের বিতর্কিত সদস্য এমডি রায়হান সিদ্দিকি এবং তার সহযোগী চক্রের বিরুদ্ধে উঠে এসেছে চরিত্র হনন ও পরিকল্পিত ব্ল্যাকমেইলিংয়ের চাঞ্চল্যকর অভিযোগ। প্রেম প্রস্তাবে সাড়া না পেয়ে একজন সম্মানিত সরকারি চাকুরীজীবীর বিরুদ্ধে সামাজিক ও পেশাগত জীবন ধ্বংসের যে নোংরা খেলায় মেতে উঠেছেন এমডি রায়হান সিদ্দীকি নামের এক যুবক, তা পুরো জেলার গণমাধ্যম ও প্রশাসনিক পাড়ায় তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।
গত ৫ ও ৮ আগস্ট একটি সংবাদপত্রের ই-মেইল ঠিকানায় রায়হানের নিজস্ব জিমেইল (rayhansiddiquekenakata@gmail.com) থেকে ওই নারী কর্মকর্তাকে জড়িয়ে চরম আপত্তিকর ও কুরুচিপূর্ণ মিথ্যা তথ্য পাঠানো হয় স্থাণীয় একটি পত্রিকায়। ব্যক্তিগত আক্রোশ মেটাতে গণমাধ্যমকে ব্যবহার করার এই অপচেষ্টা সম্পাদকের নজরে এলে শুরু হয় নিবিড় অনুসন্ধান। বেরিয়ে আসে এক ভয়ংকর ষড়যন্ত্রের গল্প।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ভুক্তভোগী নারী শর্মিষ্ঠা সরকার জেলার কালিগঞ্জ উপজেলার এক সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান, ১৭ বছরের সন্তানের জননী এবং সফল ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা। নিজেকে স্থানীয় পরিচয় দিয়ে অফিসে যাতায়াতের সুবাদে ওই কর্মকর্তাকে কুপ্রস্তাব দেয় কথিত সাংবাদিক এমডি রায়হান। প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর রায়হানের বখাটেপনা মাত্রা ছাড়ায়।
সরকারি অফিসে ঢুকে শর্মিষ্ঠী সরকারের টেবিলের সামনে বসে, কখনো পাশের টেবিলে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধ্যানে বসার ভং ধরে মানসিক নির্যাতন চালাতে থাকে সে। কাজের পরিবেশ বিষাক্ত হয়ে উঠলে ওই কর্মকর্তা একাধিকবার দাপ্তরিক কাজ ফেলে কর্মস্থল ত্যাগ করতে এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানাতে বাধ্য হন।
ব্যর্থতার গ্লানি ও প্রতিশোধের নেশায় উন্মাদ হয়ে রায়হান শহরের অন্তত ১৫ জন কথিত সংবাদকর্মীর দ্বারে দ্বারে ঘোরে। নিজেকে ওই কর্মকর্তার ‘পরকীয়া প্রেমিক’ হিসেবে দাবি করে এক কাল্পনিক নাটক সাজায়। এমনকি দাপ্তরিক প্রধান অর্থাৎ উপজেলা সহকারী কমিশনারের (ভূমি) সঙ্গে ওই নারীর কাল্পনিক ও অনৈতিক সম্পর্কের ইঙ্গিত ছড়িয়ে কুরুচিপূর্ণ খবর প্রচারের চেষ্টা করে। কিছু সংবাদকর্মীকে বিভ্রান্ত করতে কান্নাকাটির ভণ্ডামিও করে সে। ফলে কোনো প্রকার সত্যতা যাচাই ছাড়াই কিছু সামাজিক মাধ্যম ও নামসর্বস্ব পোর্টালে এই মিথ্যা বানোয়াট খবর ছড়িয়ে দেওয়া হয়।
অনুসন্ধানে আরও দেখা যায়, কেবল চরিত্র হননই নয়, রায়হান ও তার সহযোগী সুমন মুখার্জি ভুক্তভোগী নারীর পরিবারকে জিম্মি করে প্রায় দুই লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেছে।
এ বিষয়ে ভুক্তভোগী কর্মকর্তা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন: একজন বখাটে সাংবাদিকতার নাম ভাঙিয়ে দাপ্তরিক কাজে বাধা সৃষ্টি করেছে। এতে সফল না হয়ে আমার পরিবারকে জিম্মি করে দুই লাখ টাকা চাঁদা নিয়েছে। এখন আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমার নামে চরম মিথ্যাচার চালাচ্ছে। দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে, এই অপরাধীদের বিরুদ্ধে আমি এবার কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেব।
অনুসন্ধানী টিমের মুখোমুখি হয়ে যখন রায়হানকে সাংবাদিকতার ন্যূনতম নিয়ম এবং কারো চরিত্র হনন করার অধিকার নিয়ে প্রশ্ন করা হয়, তখন সে কোনো যুক্তি দিতে পারেনি। গড়গড় করে কথিত ‘গভীর সম্পর্ক’ ও ‘প্রমাণ’ থাকার ধুঁয়া তুললেও, বারবার সময় দেওয়া সত্ত্বেও একটিমাত্র দাপ্তরিক বা ব্যক্তিগত প্রমাণ হাজির করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয় এই প্রতারক।
অফিসে গিয়ে হইচই করা এবং কুরুচিপূর্ণ প্রচারণার বিষয়ে সহকারী কমিশনার (ভূমি) স্পষ্ট জানান: কিছু অসাধু ব্যক্তি এসে ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অপেশাদার আচরণ করেছে। তবে তাদের মধ্যে প্রকৃত সাংবাদিক প্রায় কেউই ছিল না। সরকারি কাজের পরিবেশ ক্ষুণ্ন করা এবং বিভ্রান্তি ছড়ানোর বিষয়টি প্রশাসন অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পর্যবেক্ষণ করছে।
রাজনৈতিক পরিচয় ও সাংবাদিকতার ভুয়া মুখোশ ব্যবহার করে একজন দায়িত্বশীল নারী সরকারি কর্মকর্তাকে এভাবে হেনস্তা করা একটি মারাত্মক ফৌজদারি অপরাধ।
ভুয়া খবরের আড়ালে এই চাঁদাবাজি ও ব্লাকমেইলিং চক্রের মূল হোতাদের দ্রুত আইনের আওতায় না আনলে সরকারি দপ্তরের নিরাপত্তা ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা- উভয়ই চরম হুমকির মুখে পড়বে।




















