শিবচরে বিদ্রোহী প্রার্থীদের চাপে বিএনপি, নির্বাচনি সমীকরণে জটিলতা
মাদারীপুর-১ (শিবচর) আসনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে বিএনপি পড়েছে চরম চাপে। দলীয় বিদ্রোহী প্রার্থীদের কারণে এই আসনে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল এখন প্রকাশ্য নির্বাচনি সংকটে রূপ নিয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয় ভোটার ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
এই আসনে বিএনপির চূড়ান্ত মনোনীত প্রার্থী চৌধুরী নাদিরা আক্তার। তবে দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক সাজ্জাদ হোসেন সিদ্দিকী লাবলু স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ফুটবল প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। একইভাবে প্রাথমিকভাবে মনোনয়ন পেলেও তা স্থগিত হওয়ায় শিবচর উপজেলা বিএনপির কার্যকরী সদস্য কামাল জামান মোল্লা জাহাজ প্রতীক নিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মাঠে রয়েছেন।
দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করায় সাজ্জাদ হোসেন ও কামাল জামানকে বিএনপি থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। তবে মাঠপর্যায়ে তাদের সাংগঠনিক প্রভাব ও অনুসারীদের অবস্থান নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন স্থানীয় বিএনপি নেতারা।
স্বতন্ত্র প্রার্থী সাজ্জাদ হোসেন সিদ্দিকী বলেন, “২০১৮ সালের নির্বাচনে আমি বিএনপির মনোনীত প্রার্থী ছিলাম। আমার বিরুদ্ধে কোনো দুর্নীতি বা স্বজনপ্রীতির অভিযোগ নেই। দলের দুঃসময়ে রাজপথে সক্রিয় থেকেছি। অথচ এবার কেন আমাকে মনোনয়ন দেওয়া হয়নি—এ প্রশ্ন সাধারণ মানুষেরও।
অন্যদিকে কামাল জামান মোল্লা বলেন, “আমি দীর্ঘদিন ধরে এলাকার মানুষের পাশে ছিলাম। প্রাথমিক মনোনয়ন দেওয়ার পরও তা বাতিলের কোনো ব্যাখ্যা পাইনি। জনগণের সমর্থন নিয়েই আমি নির্বাচনে আছি।
স্থানীয় বিএনপির একাধিক নেতা জানান, বিদ্রোহী প্রার্থীদের কারণে নেতাকর্মীদের মধ্যে বিভক্তি সৃষ্টি হয়েছে, যা ভোটের মাঠে নাদিরা আক্তারের জন্য পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে।রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও বিদ্রোহী প্রার্থীদের উপস্থিতি শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
এদিকে শিবচরের রাজনীতিতে তৈরি হয়েছে নতুন সমীকরণ। দীর্ঘদিন নৌকা প্রতীকের পক্ষে সক্রিয় থাকা আওয়ামী লীগের একাংশের নেতাকর্মী প্রকাশ্যে ধানের শীষ প্রতীকের পক্ষে ভোট চাওয়ায় রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে।সম্প্রতি শিবচর পৌরসভার খানবাড়ী এলাকায় মরহুম সুলতান খানের বাড়িতে বিএনপি প্রার্থী চৌধুরী নাদিরা আক্তারের সমর্থনে একটি নির্বাচনি উঠান বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে আওয়ামী লীগের সাবেক ও বর্তমান বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী উপস্থিত হয়ে নাদিরা আক্তারের প্রতি প্রকাশ্যে সমর্থন জানান।
উঠান বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন শিবচর পৌর বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক হেমায়েত হোসেন খান। উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব সোহেল রানার সঞ্চালনায় প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন নাদিরা আক্তার। এ সময় বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের বিভিন্ন স্তরের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।সভায় উপস্থিত আওয়ামী লীগ নেতাদের মধ্যে ছিলেন শিবচর পৌরসভার সাবেক মেয়র মো. আওলাদ হোসেন খান, সাবেক উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান বিএম আতাহার বেপারি ও ফাহিমা আক্তার, বিভিন্ন ইউনিয়নের বর্তমান ও সাবেক চেয়ারম্যান ও কাউন্সিলরসহ কয়েক হাজার নেতাকর্মী।
আওয়ামী লীগ নেতারা জানান, জাতীয় সংসদের সাবেক চিফ হুইপ ও সাবেক সংসদ সদস্য নূর-ই-আলম চৌধুরীর নির্দেশে তারা নাদিরা আক্তারকে সমর্থন করছেন এবং ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীকে ভোট দেবেন।সাবেক পৌর মেয়র মো. আওলাদ হোসেন খান বলেন, “দীর্ঘদিন নানা সমস্যার কারণে আমরা নিজ এলাকায় থাকতে পারিনি। আমাদের নেতার নির্দেশে আজ আমরা একত্রিত হয়েছি। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি ঐক্যবদ্ধ হওয়ায় শিবচরে কেউ আমাদের আটকাতে পারবে না।
নাদিরা আক্তার বলেন, “আমাদের দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন—সবার আগে বাংলাদেশ। আর আমরা বলছি, সবার আগে শিবচর। আমরা ঐক্যবদ্ধ থাকলে শিবচরকে আধুনিক ও উন্নত জনপদে রূপান্তর করা সম্ভব।অন্যদিকে নিজ দলের প্রার্থী থাকা সত্ত্বেও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের হাতপাখা প্রতীকের পক্ষে মাঠে নেমেছেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, শিবচর শাখার সভাপতি মাওলানা শাহ আলম তালুকদার। তার এ অবস্থান স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
তিনি বলেন, “শেষ মুহূর্তে আমাকে না জানিয়ে কেন্দ্র থেকে অন্য প্রার্থী ঘোষণা করায় তৃণমূল নেতাকর্মীরা হতাশ হয়েছেন। তাই আমি হাতপাখা মার্কার পক্ষে কাজ করছি।হাতপাখা প্রতীকের প্রার্থী মাওলানা আকরাম হুসাইন বলেন, শিবচরের মানুষ আমাদের ভালোভাবে গ্রহণ করছে। ইনশাআল্লাহ, এই আসনে আমরাই বিজয়ী হব।
উল্লেখ্য, মাদারীপুর-১ আসনে ১০ দলীয় জোটের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস রিকশা প্রতীকে মাওলানা সাইদ উদ্দিন আহমাদ হানজালাকে প্রার্থী করেছে।


























