ভাইয়ের লাশ নিতে এক ভাই এলেন লন্ডন থেকে, আরেক ভাই এলেন আফগানিস্তান থেকে!
ভাইয়ের প্রতি ভালোবাসা যে কতটা গভীর হতে পারে, এই ঘটনা যেন তারই এক অবিশ্বাস্য উদাহরণ।
হাজার হাজার মাইলের দূরত্ব, দেশের সীমানা, কাগজপত্রের জটিলতা কিংবা দীর্ঘ ১৪০ দিনের অপেক্ষা—কোনো কিছুই একজন ভাইকে তাঁর ভাইয়ের কাছে ফিরতে বাধা দিতে পারেনি।
গত ১৩ এপ্রিল ঝিনাইদহের মহেশপুর সীমান্তের ইছামতী নদী থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল এক অজ্ঞাত ব্যক্তির মরদেহ। পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব না হওয়ায় পরদিন বেওয়ারিশ হিসেবে তাঁকে দাফন করা হয়।
সেখানেই হয়তো গল্পটির শেষ হয়ে যাওয়ার কথা ছিল।
কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া সেই মরদেহের ছবি বদলে দেয় পুরো গল্প।
দূর আফগানিস্তানে বসে একটি পরিবার ছবিটি দেখে চিনে ফেলে তাদের আপনজনকে। জানা যায়, মৃত ব্যক্তি হাসমত মোহাম্মাদী, একজন আফগান নাগরিক ও ব্যবসায়ী।
ভাইয়ের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে নিতে প্রথমে লন্ডন থেকে বাংলাদেশে ছুটে আসেন তাঁর এক ভাই। কিন্তু আইনি জটিলতার কারণে শেষ পর্যন্ত মরদেহ নিতে না পেরে তাঁকে ফিরে যেতে হয়।
তবুও থেমে থাকেনি পরিবারের চেষ্টা।
এরপর আফগানিস্তান থেকে বাংলাদেশে আসেন আরেক ভাই ইমাল মোহাম্মাদী। নিজের ভাইয়ের মরদেহ ফিরে পাওয়ার আশায় প্রায় দুই মাস ধরে তিনি ঘুরেছেন প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে। সংগ্রহ করেছেন প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, পরিচয়ের প্রমাণ এবং প্রয়োজনীয় অনুমোদন।
অবশেষে আসে সেই প্রতীক্ষিত দিন।
১ সেপ্টেম্বর, দাফনের ১৪০ দিন পর খুলে দেওয়া হয় কবর।
দীর্ঘ অপেক্ষার পর মাটির নিচ থেকে তুলে আনা হয় হাসমত মোহাম্মাদীর মরদেহ। আর সেই মরদেহ শেষ পর্যন্ত তুলে দেওয়া হয় তাঁর ভাইয়ের হাতে।
একজন ভাইয়ের জন্য এর চেয়ে ভারী মুহূর্ত আর কী হতে পারে?
যে ভাইকে জীবিত অবস্থায় আর ফিরে পাওয়া হলো না, অন্তত তাঁর শেষ ঠিকানাটুকু নিজের দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার সুযোগ যেন হারাতে চাননি ইমাল।
আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলামের একজন কর্মী জানিয়েছেন, দীর্ঘ সময় কবরের নিচে থাকার পরও মরদেহের চেহারা নাকি বেশ অক্ষত ছিল। বিষয়টি উপস্থিত অনেকের কাছেই বিস্ময়ের সৃষ্টি করে।
তবে এই গল্পের পেছনে এখনো রয়ে গেছে অনেক প্রশ্ন।
হাসমত কীভাবে বাংলাদেশে এসেছিলেন?
কেন তিনি ইছামতী নদীর কাছে গিয়েছিলেন?
তাঁর সঙ্গে থাকা কথিত ব্যক্তিদের ভূমিকা কী ছিল?
সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশের পর তাঁর সঙ্গে আসলে কী ঘটেছিল?
পরিবারের পক্ষ থেকে নানা সন্দেহের কথা বলা হলেও ময়নাতদন্তে তাঁর মৃত্যুর কারণ হিসেবে হৃদরোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। প্রকৃত ঘটনা কী, তা নিশ্চিতভাবে জানা যাবে তদন্তের মাধ্যমেই।
তবে সব প্রশ্নের ঊর্ধ্বে উঠে যে দৃশ্যটি মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে যায়, সেটি হলো—
১৪০ দিন পর এক ভাই তাঁর ভাইকে নিতে এসেছেন।
ভাষা ভিন্ন হতে পারে, দেশ ভিন্ন হতে পারে, সীমানা হাজার মাইল দূরে হতে পারে। কিন্তু রক্তের সম্পর্ক আর আপনজনের প্রতি ভালোবাসার কোনো সীমান্ত নেই।
কবরের মাটি একজন মানুষকে আটকে রাখতে পারে,
কিন্তু একজন ভাইয়ের ভালোবাসাকে আটকে রাখতে পারে না।
ভাইয়ের প্রতি ভাইয়ের এমন ভালোবাসার ঘটনা চোখে না দেখলে হয়তো বিশ্বাসই হতো না।
কিছু সম্পর্কের কাছে দূরত্ব হার মানে,
কাগজপত্রের জটিলতা হার মানে,
সময়ও একদিন হার মানে।
শেষ পর্যন্ত জয়ী হয় শুধু ভালোবাসা।
























