লোনা মাটিতে মিষ্টি আঙুরের বিপ্লব উদ্যোক্তা অভাবনীয় সাফল্য
উপকূলের লোনা বাতাস আর প্রতিকূল আবহাওয়ায় যেখানে সাধারণ ফসল ফলাতেই হিমশিম খেতে হয়, সেখানে বিদেশি মিষ্টি আঙুর চাষ করে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন পাইকগাছার এক অদম্য সাহসী কৃষক তৈয়েবুর রহমান।
শখের বশে শুরু করা এই চাষ এখন উপকূলীয় কৃষিতে নতুন এক বাণিজ্যিক সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। লোনা পানিতেও আঙুরের হাতছানি দিচ্ছে খুলনার পাইকগাছা উপজেলার কপিলমুনি ইউনিয়নের বিরাশি গ্রাম। গ্রামের এক কোণে তাকালে মনে হবে এ যেন বিদেশের কোনো আঙুর বাগান।
মাচায় মাচায় থোকায় থোকায় ঝুলছে বাইকোনুর, পার্পেল, গ্রিন লং, একলো এবং সুপার নোভা সহ ১০টি ভিন্ন জাতের আঙুর। কোনো কোনো থোকার ওজন ছাড়িয়ে গেছে এক কেজি। ইতোমধ্যে স্কোয়াশ চাষে উপজেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ কৃষকের স্বীকৃতি পাওয়া তৈয়েবুর রহমান এবার বেছে নিয়েছেন এই চ্যালেঞ্জিং আঙুর চাষ। তার এই অভাবনীয় সাফল্য দেখতে প্রতিদিন ভিড় করছেন স্থানীয় কৃষক ও উৎসুক দর্শনার্থীরা।
যেভাবে এলো এই সফলতা সেই অভিব্যক্তিতে তৈয়েবুর রহমান জানান, ইউটিউব ও কৃষিভিত্তিক ওয়েবসাইটের সহায়তায় তিনি এই চাষের কলাকৌশল রপ্ত করেন। গত বছর মাত্র দুটি গাছ দিয়ে পরীক্ষা শুরু করলেও বর্তমানে তার বাগানে প্রায় ২০টি বড় গাছ এবং বিক্রির জন্য প্রায় এক হাজার চারা রয়েছে। তিনি প্রথাগত পদ্ধতির বদলে ‘জিও ব্যাগ’ ও আধুনিক মাচা পদ্ধতি ব্যবহার করছেন।
জিও ব্যাগের সুবিধার ফলে গাছের শিকড় নিয়ন্ত্রণ করা যায় এবং লোনা মাটির বিরূপ প্রভাব এড়িয়ে প্রয়োজনীয় সার ও পানি ব্যবস্থাপনা সহজ হয়। বর্তমানে তার বাগানের চারাগুলো ১শত থেকে ৩শত টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে, যা স্থানীয় কৃষকদের মাঝে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি করেছে। উদ্যোক্তা তৈয়েবুর রহমান বলেন, “প্রথমে শখের বশে শুরু করলেও এখন এর বাণিজ্যিক সম্ভাবনা আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি।
লোনা এলাকায় যে মিষ্টি আঙুর হওয়া সম্ভব, তা আমি প্রমাণ করতে পেরেছি। কেউ যদি এই চাষে এগিয়ে আসতে চায়, তবে আমি তাদের সব ধরনের কারিগরি সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত।” এদিকে, তৈয়েবুর রহমানের এই সাফল্য দেখে স্থানীয় অনেক কৃষক এখন আঙুর চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন। প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ তার বাগান দেখতে আসছেন এবং চারা সংগ্রহ করছেন।
উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ মো. একরামুল হোসেন এই উদ্যোগকে ‘ব্যতিক্রমী ও বৈপ্লবিক’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, “সাধারণত উপকূলীয় মাটি আঙুর চাষের জন্য অনুকূল নয় বলে মনে করা হয়। কিন্তু তৈয়েবুর রহমান আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে সেই ধারণাকে ভুল প্রমাণ করেছেন। কৃষি বিভাগ থেকে তাকে প্রয়োজনীয় সকল পরামর্শ প্রদান করা হচ্ছে এবং এই মডেল পুরো উপজেলায় ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।”
পাইকগাছার লোনা মাটিতে এই মিষ্টি আঙুর চাষ কেবল একটি ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, বরং এটি উপকূলীয় অঞ্চলের প্রতিকূলতাকে জয় করার এক নতুন উদাহরণ। সরকারি ও বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এই ‘আঙুর বিপ্লব’ দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে বলে মনে করছেন সংশিষ্টরা।




















