পিরোজপুরে ৩১ ভাসমান হাটে নৌকার সারি
ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে খালের বুকে ভেসে ওঠে শত শত নৌকা। কোথাও সবজি, কোথাও ধান কিংবা চাল, আবার কোথাও পেয়ারার গন্ধে মুখর চারপাশ। নৌকার ওপর নৌকা ঠাসাঠাসি—তবু কোথাও নেই বিশৃঙ্খলা। এ যেন প্রকৃতি আর মানুষের সহাবস্থানে গড়ে ওঠা এক জীবন্ত অর্থনীতি। পিরোজপুরের স্বরূপকাঠি উপজেলার ভাসমান হাটগুলো এমনই এক অনন্য দৃশ্যপট।
প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করতে অনেকেই পাড়ি জমান দেশের বাইরে। কিন্তু দেশেই যদি পাওয়া যায় ব্যাংককের ভাসমান বাজারের ছোঁয়া—তাও আবার আরও আপন আবহে—তাহলে দূরে যাওয়ার দরকার কোথায়? বৃহত্তর বরিশালের স্বরূপকাঠি উপজেলার ১০টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় ছড়িয়ে থাকা ৩১টি ভাসমান হাট সেই অভিজ্ঞতাই দেয়। নদীবেষ্টিত এই জনপদের তিনটি বন্দর ও ২৮টি বাজারের বেশির ভাগই কোনো না কোনো খাল বা নদীর তীরে অবস্থিত। খালের বুকেই চলে পাইকারি ও খুচরা বেচাকেনা। নৌকা কিংবা ছোট লঞ্চে চড়ে এক বাজার থেকে আরেক বাজারে যেতে যেতে মনে হয়—“একি অপরূপ রূপে মা তোমার হেরিনু পল্লী জননী।
সূর্যোদয় থেকে মধ্যরাত কিছু হাট সূর্য ওঠার সঙ্গে শুরু হয়ে চলে সূর্যাস্ত পর্যন্ত। আবার কোনো কোনো হাট বসে মধ্যরাত পর্যন্ত। আবার কোথাও মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই শেষ হয়ে যায় কেনাবেচা। সময় ভেদে বদলায় পণ্যের ধরনও।পেয়ারার ভাসমান বাজার তো আছেই, পাশাপাশি রয়েছে ধান, চাল, মাছ, সবজি, মৌসুমি ফল, ফুলের চারা, বনজ গাছের চারা, ধানের চারা ও সবজির চারার হাট। রয়েছে দেশের বৃহত্তম ভাসমান গোলকাঠের বাজার। বাড়তি আকর্ষণ হিসেবে আছে শুধু নারীদের জন্য বিশেষ ভাসমান বাজার—‘বউ বাজার’।
কোথায় কত বাজার স্বরূপকাঠি উপজেলার সুটিয়াকাঠি ইউনিয়নে রয়েছে ৩টি, সোহাগদল ইউনিয়নে ৩টি, বলদিয়া ইউনিয়নে ৬টি, দৈহারী ইউনিয়নে ৩টি, গুয়ারেখা ইউনিয়নে ৪টি, সারেংকাঠি ইউনিয়নে ১টি, আটঘর কুড়িয়ানা ইউনিয়নে ৩টি, জলাবাড়ি ইউনিয়নে ৩টি, সমুদয়কাঠি ইউনিয়নে ৪টি এবং স্বরূপকাঠি পৌরসভায় ১টি বাজার।প্রায় প্রতিটি বাজারের পাশ দিয়েই বয়ে গেছে নদী বা খাল। এসব জলপথেই চলে মূল কেনাবেচা। দেশের সর্ববৃহৎ ভাসমান কাঠের বাজার বসে স্বরূপকাঠির শীতলা খাল ও সন্ধ্যা নদীর সংযোগস্থলে এবং ইন্দুরহাট ও মিয়ারহাটের মধ্যবর্তী খালে। বিশেষ করে সোম ও বৃহস্পতিবার হাটের দিন জমে ওঠে বেচাকেনা।
বউ বাজার থেকে নৌকার হাট বলদিয়া ইউনিয়নের পঞ্চবেকি বাজারসংলগ্ন খাল, সোহাগদলের সুপারিতলা এবং সুটিয়াকাঠির কালিবাড়ি গোপে প্রতি সপ্তাহে সোম ও বৃহস্পতিবার বসে ‘বউ বাজার’। এখানে গ্রামের নারীরা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনেন ভাসমান বিক্রেতাদের কাছ থেকে।
ধানের চারার হাট বসে সারেংকাঠির করফা বাজারে সোম ও বৃহস্পতিবার, জলাবাড়ি বাজারে রোববার ও বুধবার, ইদলকাঠি বাজারে সোম ও শুক্রবার। চালের ভাসমান বাজার বসে সুটিয়াকাঠির মিয়ারহাট ও স্বরূপকাঠির লঞ্চঘাটসংলগ্ন সন্ধ্যা নদীতে সোম ও বৃহস্পতিবার।
সুপারির হাট, নৌকার হাট, ভাসমান সবজির হাট—প্রতিটি হাটই আলাদা পরিচয়ে আলাদা দিনে বসে। সকালবেলা প্রায় সব বাজারেই বসে মৌসুমি সবজির ভাসমান হাট।
অল্প খরচে বড় অভিজ্ঞতা।সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হলো—এই অনন্য অভিজ্ঞতা নিতে খুব বেশি খরচও নয়। বাস বা লঞ্চে যাতায়াতসহ দুই রাত এক দিনের ভ্রমণে প্রায় তিন হাজার টাকার মধ্যেই ঘুরে আসা যায় স্বরূপকাঠির ভাসমান হাটগুলো। প্রকৃতি, মানুষের জীবনযাপন আর ঐতিহ্যের মেলবন্ধনে এ এক নির্মল আনন্দ।




















