Dhaka ০৩:৪৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৩১ জুলাই ২০২৬, ১৬ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনামঃ
রতনপুরে দিনব্যাপী গনসংযোগ ও মতবিনিময় করেন এমপি রবিউল বাশার তালায় আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভা অনুষ্ঠিত কালিগঞ্জের উত্তর শ্রীপুর আদর্শ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে চুরি থানায় অভিযোগ বিতর্কিতদের বাদ দিয়ে গ্রহণযোগ্য আহ্বায়ক কমিটি চায় শ্যামনগর বিএনপির তৃণমূল শার্শার বাহাদুরপুর ইউপি চেয়ারম্যান পদে আলোচনায় আসাদুজ্জামান আসাদ রাতের খাবারে চেতনানাশক,একই পরিবারের ৩ সদস্য হাসপাতালে বেনাপোল সীমান্তে বিজিবি’র অভিযানে বিদেশী মদ জব্দ রাজারহাটে অবৈধ মাছ শিকারে অভিযান, ৫০টি নিষিদ্ধ জাল জব্দ মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স, শুরু হচ্ছে ৭ দিনের বিশেষ অভিযান’ জেলা আ’লীগের সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম ঢাকা থেকে গ্রেপ্তার

সিন্দুরমতি দিঘীর নবমী তীর্থস্নান জলের তলে বিশ্বাস মাটির ওপর মেলা শুরু।

সিন্দুরমতি দিঘীর নবমী তীর্থস্নান জলের তলে বিশ্বাস মাটির ওপর মেলা শুরু।

রতন রায় :কুড়িগ্রাম জেলা প্রতিনিধি।

লালমনিরহাট-কুড়িগ্রাম জেলা রাজারহাটে আকাশে তখনও ভোরের রঙ পুরোপুরি মেলেনি। পূর্ব দিগন্তে আলো ফোটার আগে আগে এক ধরনের নরম অন্ধকারে ঢেকে গেছে চারদিক। সেই অন্ধকার ভেদ করেই মানুষের ঢল নামে সিন্দুরমতি দিঘীর পাড়ে। কারও কাঁধে গামছা, কারও হাতে ফুল আর ধূপ, কারও চোখে বহুদিনের মানত পূরণের নীরব প্রত্যাশা।

চৈত্রের নবমী। ক্যালেন্ডারের একটি তারিখ কিন্তু এই অঞ্চলের মানুষের কাছে তা শুধু দিন নয়, এক অভিজ্ঞতা; একবার অন্তত জলের ভেতর নেমে নিজের ভেতরটাকে ধুয়ে নেওয়ার আকাঙ্ক্ষা।

সকাল ৬টা। দিঘীর জল তখন স্থির। যেন বহু শতাব্দীর স্মৃতি জমে আছে তার স্তরে স্তরে। প্রথম সূর্যের আলো পড়তেই জলের গায়ে ঝিলিক লাগে, আর সেই ঝিলিকের ভেতরেই নেমে পড়েন মানুষজন। কেউ নিঃশব্দে, কেউ মন্ত্রোচ্চারণে, কেউ বা চোখ বুজে। জল ছিটকে ওঠে, আবার শান্ত হয়। এই ওঠানামার ভেতরেই যেন মিশে থাকে বিশ্বাস আর বেঁচে থাকার সহজ সমীকরণ।

আরও পড়ুনঃ  বিতর্কিতদের বাদ দিয়ে গ্রহণযোগ্য আহ্বায়ক কমিটি চায় শ্যামনগর বিএনপির তৃণমূল

কেউ বলেন, এই জলে স্নান করলে পাপ মোচন হয়। কেউ বলেন, মনস্কামনা পূর্ণ হয়। আবার কেউ কোনো ব্যাখ্যায় যান না শুধু প্রতি বছর এই দিনে এখানে এসে দাঁড়ান, যেন একটি অদৃশ্য টানে টেনে আনে তাঁকে। বিশ্বাসের ভাষা যে সবসময় যুক্তির ভাষা নয়, তা এখানে এসে বোঝা যায়।

দিঘীর পাড়ে তখন অন্য এক জগৎ গড়ে ওঠে। জলের ভেতরের নীরবতার পাশে মাটির ওপর জমে ওঠে মেলার কোলাহল। সারি সারি অস্থায়ী দোকান মাটির হাঁড়ি, বাঁশের তৈরি ঝুড়ি, কাঁচের চুড়ি, রঙিন খেলনা। বাতাসে ভেসে আসে জিলাপির গন্ধ, ভাজা মুড়ির মিষ্টি গন্ধ, আর মানুষের কণ্ঠের টানটান সুর।

একটি শিশুর হাতে ঘুড়ি। সে মেলার ভিড়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকায়, যেন দিঘীর জল আর আকাশের নীল দুটোকেই সে নিজের মতো করে ধরতে চায়। পাশে তার মা, স্নান শেষে ভেজা কাপড় সামলে দাঁড়িয়ে আছেন। চোখে এক ধরনের প্রশান্তি যা ব্যস্ত শহরের মানুষ সহজে খুঁজে পায় না।

আরও পড়ুনঃ  স্বাস্থ্য মন্ত্রীর তালা হসপিটাল পরিদর্শন ডাক্তারকে বদলি ও নৈশ প্রহরী বরখাস্ত

এই মেলা শুধু কেনাবেচার জায়গা নয়। এটি স্মৃতিরও বাজার। বহু বছর পর দেখা হয় আত্মীয়ের সঙ্গে, পুরোনো বন্ধুর সঙ্গে। কেউ গল্পে মেতে ওঠেন, কেউ হারিয়ে যান ভিড়ের ভেতর। আবার হঠাৎ করেই কারও সঙ্গে চোখাচোখি, ‘কেমন আছ?’ এই সহজ প্রশ্নেই ফিরে আসে অনেকদিনের দূরত্ব।

স্থানীয় প্রবীণরা বলেন, এই দিঘীর ইতিহাস বহু পুরোনো। জনশ্রুতি আছে, এক জমিদার জলের আশায় এই দিঘী খনন করিয়েছিলেন। সময়ের সঙ্গে সেই ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা রূপ নিয়েছে সমষ্টিগত বিশ্বাসে। একটি মানুষের গল্প ধীরে ধীরে হয়ে উঠেছে হাজার মানুষের তীর্থ।

দুপুরের দিকে রোদ চড়ে বসে। মেলার ভিড় তখন ঘন হয়ে ওঠে। মাইকে ভেসে আসে ঘোষণা, কোথাও বাউলসুর, কোথাও শিশুদের হাসি। তবু দিঘীর জলে এক ধরনের স্থিরতা থেকে যায় যেন সমস্ত কোলাহলের বাইরে তার নিজস্ব এক নীরবতা আছে।

আরও পড়ুনঃ  সাতক্ষীরার তিন হাসপাতালে স্বাস্থ্যমন্ত্রী: দুই চিকিৎসক ও এক নিরাপত্তাকর্মীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা

বিকেলের দিকে আলো নরম হয়। দূরের গাছের ছায়া দিঘীর জলে লম্বা হয়ে পড়ে। ভিড় ধীরে ধীরে কমতে থাকে। কেউ বাড়ির পথে হাঁটেন, কেউ শেষবারের মতো দিঘীর দিকে তাকান। দিনের শেষে থেকে যায় শুধু কিছু পায়ের ছাপ, কিছু ভেজা কাপড়ের গন্ধ, আর একদিনের ভেতর জমে ওঠা অগণিত গল্প।

সিন্দুরমতি দিঘীর তীর্থস্নান ও মেলা তাই শুধু একটি ধর্মীয় আয়োজন নয়। এটি মানুষের ভেতরের অদৃশ্য জগতেরও একটি দরজা যেখানে বিশ্বাস, স্মৃতি, আনন্দ আর বেদনা একসঙ্গে মিশে যায়। জল এখানে শুধু জল নয়; এটি সময়ের ধারক। আর মেলা শুধু মেলা নয়; এটি জীবনেরই এক রঙিন প্রতিচ্ছবি।

জনপ্রিয় পোস্ট

রতনপুরে দিনব্যাপী গনসংযোগ ও মতবিনিময় করেন এমপি রবিউল বাশার

সিন্দুরমতি দিঘীর নবমী তীর্থস্নান জলের তলে বিশ্বাস মাটির ওপর মেলা শুরু।

আপডেটের সময়: ১০:৩৮:৪৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৭ মার্চ ২০২৬

সিন্দুরমতি দিঘীর নবমী তীর্থস্নান জলের তলে বিশ্বাস মাটির ওপর মেলা শুরু।

রতন রায় :কুড়িগ্রাম জেলা প্রতিনিধি।

লালমনিরহাট-কুড়িগ্রাম জেলা রাজারহাটে আকাশে তখনও ভোরের রঙ পুরোপুরি মেলেনি। পূর্ব দিগন্তে আলো ফোটার আগে আগে এক ধরনের নরম অন্ধকারে ঢেকে গেছে চারদিক। সেই অন্ধকার ভেদ করেই মানুষের ঢল নামে সিন্দুরমতি দিঘীর পাড়ে। কারও কাঁধে গামছা, কারও হাতে ফুল আর ধূপ, কারও চোখে বহুদিনের মানত পূরণের নীরব প্রত্যাশা।

চৈত্রের নবমী। ক্যালেন্ডারের একটি তারিখ কিন্তু এই অঞ্চলের মানুষের কাছে তা শুধু দিন নয়, এক অভিজ্ঞতা; একবার অন্তত জলের ভেতর নেমে নিজের ভেতরটাকে ধুয়ে নেওয়ার আকাঙ্ক্ষা।

সকাল ৬টা। দিঘীর জল তখন স্থির। যেন বহু শতাব্দীর স্মৃতি জমে আছে তার স্তরে স্তরে। প্রথম সূর্যের আলো পড়তেই জলের গায়ে ঝিলিক লাগে, আর সেই ঝিলিকের ভেতরেই নেমে পড়েন মানুষজন। কেউ নিঃশব্দে, কেউ মন্ত্রোচ্চারণে, কেউ বা চোখ বুজে। জল ছিটকে ওঠে, আবার শান্ত হয়। এই ওঠানামার ভেতরেই যেন মিশে থাকে বিশ্বাস আর বেঁচে থাকার সহজ সমীকরণ।

আরও পড়ুনঃ  যশোরে বিজিবি'র অভিযানে স্বর্ণের বারসহ আটক-১

কেউ বলেন, এই জলে স্নান করলে পাপ মোচন হয়। কেউ বলেন, মনস্কামনা পূর্ণ হয়। আবার কেউ কোনো ব্যাখ্যায় যান না শুধু প্রতি বছর এই দিনে এখানে এসে দাঁড়ান, যেন একটি অদৃশ্য টানে টেনে আনে তাঁকে। বিশ্বাসের ভাষা যে সবসময় যুক্তির ভাষা নয়, তা এখানে এসে বোঝা যায়।

দিঘীর পাড়ে তখন অন্য এক জগৎ গড়ে ওঠে। জলের ভেতরের নীরবতার পাশে মাটির ওপর জমে ওঠে মেলার কোলাহল। সারি সারি অস্থায়ী দোকান মাটির হাঁড়ি, বাঁশের তৈরি ঝুড়ি, কাঁচের চুড়ি, রঙিন খেলনা। বাতাসে ভেসে আসে জিলাপির গন্ধ, ভাজা মুড়ির মিষ্টি গন্ধ, আর মানুষের কণ্ঠের টানটান সুর।

একটি শিশুর হাতে ঘুড়ি। সে মেলার ভিড়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকায়, যেন দিঘীর জল আর আকাশের নীল দুটোকেই সে নিজের মতো করে ধরতে চায়। পাশে তার মা, স্নান শেষে ভেজা কাপড় সামলে দাঁড়িয়ে আছেন। চোখে এক ধরনের প্রশান্তি যা ব্যস্ত শহরের মানুষ সহজে খুঁজে পায় না।

আরও পড়ুনঃ  বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যাপক নার্গিস ইসলামের সঙ্গে নাগরিক অধিকার আন্দোলন, যশোরের সৌজন্য সাক্ষাৎ

এই মেলা শুধু কেনাবেচার জায়গা নয়। এটি স্মৃতিরও বাজার। বহু বছর পর দেখা হয় আত্মীয়ের সঙ্গে, পুরোনো বন্ধুর সঙ্গে। কেউ গল্পে মেতে ওঠেন, কেউ হারিয়ে যান ভিড়ের ভেতর। আবার হঠাৎ করেই কারও সঙ্গে চোখাচোখি, ‘কেমন আছ?’ এই সহজ প্রশ্নেই ফিরে আসে অনেকদিনের দূরত্ব।

স্থানীয় প্রবীণরা বলেন, এই দিঘীর ইতিহাস বহু পুরোনো। জনশ্রুতি আছে, এক জমিদার জলের আশায় এই দিঘী খনন করিয়েছিলেন। সময়ের সঙ্গে সেই ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা রূপ নিয়েছে সমষ্টিগত বিশ্বাসে। একটি মানুষের গল্প ধীরে ধীরে হয়ে উঠেছে হাজার মানুষের তীর্থ।

দুপুরের দিকে রোদ চড়ে বসে। মেলার ভিড় তখন ঘন হয়ে ওঠে। মাইকে ভেসে আসে ঘোষণা, কোথাও বাউলসুর, কোথাও শিশুদের হাসি। তবু দিঘীর জলে এক ধরনের স্থিরতা থেকে যায় যেন সমস্ত কোলাহলের বাইরে তার নিজস্ব এক নীরবতা আছে।

আরও পড়ুনঃ  জেলা আ'লীগের সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম ঢাকা থেকে গ্রেপ্তার

বিকেলের দিকে আলো নরম হয়। দূরের গাছের ছায়া দিঘীর জলে লম্বা হয়ে পড়ে। ভিড় ধীরে ধীরে কমতে থাকে। কেউ বাড়ির পথে হাঁটেন, কেউ শেষবারের মতো দিঘীর দিকে তাকান। দিনের শেষে থেকে যায় শুধু কিছু পায়ের ছাপ, কিছু ভেজা কাপড়ের গন্ধ, আর একদিনের ভেতর জমে ওঠা অগণিত গল্প।

সিন্দুরমতি দিঘীর তীর্থস্নান ও মেলা তাই শুধু একটি ধর্মীয় আয়োজন নয়। এটি মানুষের ভেতরের অদৃশ্য জগতেরও একটি দরজা যেখানে বিশ্বাস, স্মৃতি, আনন্দ আর বেদনা একসঙ্গে মিশে যায়। জল এখানে শুধু জল নয়; এটি সময়ের ধারক। আর মেলা শুধু মেলা নয়; এটি জীবনেরই এক রঙিন প্রতিচ্ছবি।