লবণাক্ততার যন্ত্রণায় থাকা উপকূলের তৃষ্ণা মেটাতে হরিণাগাড়িতে মিলল স্বস্তির পানি
উপকূলীয় জনপদ হরিণাগাড়ি গ্রামে দীর্ঘদিন ধরে লবণাক্ততার কারণে সুপেয় পানির তীব্র সংকটে ভুগছেন সাধারণ মানুষ। পবিত্র রমজান মাসের ২৫ টা দিন কেটে গেলেও লোনা পানির সঙ্গে লড়াই করেই দিন কাটাতে হয়েছে সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলার হরিণাগাড়ি গ্রামের মানুষের। লবণাক্ততার কারণে গ্রামের অধিকাংশ নলকূপের পানি পানযোগ্য নয়। শুধু তাই নয় রান্না, ওজু, গোসল এমনকি থালা- বাসন ধোয়ার কাজও করা যায় না। বাধ্য হয়ে অনেক দূর থেকে পানি সংগ্রহ করতে হয় পুরো গ্রামবাসীকে। এতে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগ পোহাতে হয় নারী, শিশু ও বয়স্কদের।
হরিণাগাড়ি গ্রামের কৃষক জাহাঙ্গীর আলমের বেদনাহত স্ত্রী আমেনা পারভীন (২৬) বলেন, লোনা পানির সঙ্গে সংসার তো দূরের কথা, জীবনই চলে না। খাওয়া যায় না, ওজু–গোসল করা যায় না, রান্না করা যায় না। পুরো গ্রামজুড়ে শুধু লোনা পানি। আমাদের কষ্ট যেন চোখের লোনা পানিতে ভেসে ওঠে। মিষ্টি পানি বলতে বৃষ্টির পানি, কিন্তু সেটাও সংরক্ষণের মতো পাত্র ছিল না। এমন সময়ে জোড়দিয়া সততা সংস্থা– জেএসএস আমাদের এক হাজার লিটার ধারণক্ষমতার পানির ট্যাংক দিয়েছে। এটি আমাদের কাছে ঈদের উপহারের মতো।
বাংলাদেশ এনজিও ফাউন্ডেশনের সহায়তায় জোড়দিয়া সততা সংস্থা (জেএসএস) হরিণাগাড়ি গ্রামের শতাধিক মানুষের জন্য বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে বড় ধারণক্ষমতার পানির ট্যাংক বিতরণ করেছে।জেএসএস-এর নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক শেখ হেদায়েতুল ইসলাম বলেন, উপকূলের লবণাক্ত অঞ্চলের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে তাদের সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে। এর আগে এলাকার ৬৫৬টি পরিবারের মাঝে গরু, ছাগল, ভেড়া, সেমিপাকা লেট্রিন ও পানির ফিল্টারসহ বিভিন্ন সহায়তা বিনামূল্যে প্রদান করা হয়েছে।
পানির ট্যাংক বিতরণ উপলক্ষে শ্যামনগর উপজেলার লক্ষিনাথপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অনাড়ম্বর আলোচনা সভা ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন সমাজসেবা অধিদপ্তরের সাতক্ষীরা জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক রোকনুজ্জামান। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক শেখ হেদায়েতুল ইসলাম।
প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে প্রধান প্রশিক্ষক ছিলেন সাংবাদিক ও সমাজকর্মী শরীফুল্লাহ কায়সার সুমন।দেশ টিভি’র স্টাফ রিপোর্টার শরীফুল্লাহ কায়সার সুমন বলেন, উপকূলের মানুষের জীবন সংগ্রামের বড় অংশ জুড়ে রয়েছে নিরাপদ পানির সংকট। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে পারলে এই সংকট অনেকটাই কমানো সম্ভব। স্থানীয় মানুষকে সচেতনতা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে পানি ব্যবস্থাপনায় দক্ষ করে তুলতে হবে। এ ধরনের উদ্যোগ টেকসই হলে উপকূলের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
অনুষ্ঠানে উপকারভোগীদের মধ্যে বক্তব্য দেন সবিতা রাণী মৃধা, তুলসি রাণী পরমাণ্য, কুমারী রিবানী বালা, সুষমা বালা গায়েন, শিখা রাণী মিস্ত্রী, রাশিদা বেগম, রুপা হাওলী, নিলিমা রাণী পরমাণ্য, চন্দনা বালা মিস্ত্রী ও আমেনা পারভিন।প্রধান অতিথির বক্তব্যে সমাজসেবা অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক রোকনুজ্জামান বলেন, শ্যামনগরের লবণাক্ত অঞ্চলের মানুষের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সেবা। দেশের সব মানুষকে সমান জীবনমানের সুযোগ এনে দিতে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ একসঙ্গে কাজ করছে। সমাজসেবার বিভিন্ন সেবা পেতে কাউকে কোনো অর্থ দেওয়ার প্রয়োজন নেই এ বিষয়ে সবাইকে সচেতন থাকতে হবে।
তিনি আরও বলেন, সামনে সরকারের ফ্যামিলি কার্ড প্রকল্প চালু হচ্ছে। এটি একটি বিশেষ সরকারি সেবা, যার জন্য কোনো ধরনের অর্থ লেনদেনের সুযোগ নেই। পাশাপাশি ক্যান্সারসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্তদের জন্য সমাজসেবা অধিদপ্তরের নানা সহায়তা রয়েছে।উপকারভোগী রুপা হাওলী বলেন, লোনা পানির কারণে প্রতিদিন আমাদের অনেক কষ্ট করতে হয়। এখন বৃষ্টির পানি ধরে রাখার জন্য এই ট্যাংক পেয়ে আমরা অনেকটা স্বস্তি পেয়েছি। তিনি আরও বলেন, এই সহায়তা আমাদের জন্য খুব বড় পাওয়া। এতে অন্তত পরিবারের পানির সংকট কিছুটা হলেও কমবে।
উপকূলের লবণাক্ততার মধ্যে নিরাপদ পানির জন্য প্রতিদিন সংগ্রাম করা হরিণাগাড়ি গ্রামের মানুষের কাছে এই পানির ট্যাংক শুধু একটি উপকরণ নয় এ যেন স্বস্তির প্রতীক। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের এই উদ্যোগ গ্রামবাসীর জীবনে সামান্য হলেও স্বস্তির স্রোত বইয়ে দিয়েছে। স্থানীয়দের আশা, এমন মানবিক উদ্যোগ অব্যাহত থাকলে উপকূলের লোনা পানির কষ্ট একদিন অনেকটাই কমে আসবে।
লবণাক্ততার যন্ত্রণায় থাকা উপকূলের তৃষ্ণা মেটাতে হরিণাগাড়িতে মিলল স্বস্তির পানি























