পররাষ্ট্র নীতিতেই ফেরত যেতে চান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে বললেন যে, উনারা শহীদ জিয়ার পররাষ্ট্র নীতিতেই ফেরত যেতে চান। তার এই কথাটি প্রচন্ডভাবে ভালো লাগলা।
কারন আমরা যদি সত্যিই জিয়াউর রহমানের ফরেন পলিসিতে ফেরত যেতে পারি তাহলে নিঃসন্দেহে এ দেশ আত্মমর্যাদাশীল জাতি হিসেবে নতুন করে বিশ্ব দরবারে মাথা তুলে দাঁড়াবে।
জিয়াউর রহমান প্রেসিডেন্ট হবার আগে ও পরে মিলিয়ে প্রায় সাড়ে ৫বছর রাষ্ট্রের দায়িত্ব পালন করেন। এ সময় তিনি বহিঃবিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থানকে এমন একটি স্থানে নিয়েছিলেন যে এরপরের কোন সরকারই তার ধারের কাছে কিছু করতে পারেনি।
বাংলায় একটা কথা আছে, “এলেন, দেখলেন এবং জয় করলেন”। জিয়ার পররাষ্ট্রের সাফল্য ছিল এমনই। তিনি যেই রাষ্ট্রপ্রধানদের সাথেই বসেছেন সকলের মন জয় করেছেন।
কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, জিয়াউর রহমানের এই অভাবনীয় সাফল্যের গল্প নতুন প্রজন্ম তো দূরের কথা, আমার মনে হয় বিএনপির অনেক নেতাকর্মীরাও ঠিকমত জানেনা।
শহীদ জিয়ার পররাষ্ট্রের সাফল্যের তেমনি কয়েকটা ঘটনা বলছি।
বাংলাদেশের সংবিধানে পররাষ্ট্র নীতি বিবৃত হয়েছে অনুচ্ছেদ ২৫, ৬৩ এবং ১৪৫(ক)তে। ১৯৭৮ সালে স্বচ্ছতা নিশ্চিতের স্বার্থে জিয়াউর রহমান ১৪৫(ক) সংযোজন করেন। তাতে বলা হয়, বিদেশের সাথে সকল সম্পাদিত চুক্তি প্রেসিডেন্টের সামনে পেশ করা হবে এবং তিনি তা পার্লামেন্টের কাছে পেশ করবেন। আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, পরের কোন সরকারই বিদেশি চুক্তি পার্লামেন্টে উত্থাপন করেনি।
১৯৭৭ সালে জিয়া ২৫ অনুচ্ছেদে একটি ধারা সংযোজন করেন। তাতে বলা হয়, ‘রাষ্ট্র ইসলামী সংহতির ভিত্তিতে মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে ভাতৃত্বের সম্পর্ক সংহত, সংরক্ষণ এবং জোরদার করিতে সচেষ্ট হইবে।”
এই ধারাটি ২০১৩ সালের ফ্যা/সি/স্ট হা-সি-না সরকার পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে রোহিত করে। আমার মতে এটি পুনরায় সংযোজন করা খুবই জরুরী।
জিয়াউর রহমান পররাষ্ট্রনীতি সম্পর্কে বলতেন, “এটা কোন কঠিন বিষয় নয়। এর সবচেয়ে বড় জিনিস হলো জাতীয় সত্তা এবং জাতীয় স্বার্থ হাসিল করা।” তিনি সবসময় অভিজ্ঞ কূটনীতিকদের মতামত গ্রহণ করতেন।
১৯৭৬ সাল, জিয়াউর রহমান তখন উপসামরিক আইন প্রশাসক এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত। সে বছর ১১ই মে তিনি তুরস্কে যান ওআইসির পররাষ্ট্র মন্ত্রীদের ৭ম সম্মেলনে যোগ দিতে।
সেখানে আলোচ্য সূচির বাইরে গিয়ে তিনি তার বক্তৃতায় গঙ্গার পানি বন্টনের ইস্যুটি তুলে ধরেন। তার সাথে আগত বাংলাদেশী কূটনীতিকরা তাকে এটি উত্থাপনে বারণ করেন কিন্তু তিনি তাও বিষয়টি তোলেন। তার উদ্দেশ্য ছিল, মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর মাধ্যমে ভারতকে চাপ দেয়া।
এই সম্মেলন শেষে সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী জিয়াকে তার দেশে আমন্ত্রণ জানান।
জিয়া বলেন, উপযুক্ত সময় কখন? সৌদি প্রিন্স বলেন, আগামীকাল নয় কেন? জিয়া সাথে সাথে রাজি হন এবং বলেন, ঠিক আছে। আগামীকাল! তিনি তার স্টাফদের বলেন, ২৪ ঘন্টার মধ্যে সৌদি আরব পৌঁছানোর ব্যবস্থা কর এবং তাই করা হয়।
সৌদি আরব পৌছলে তাকে রাষ্ট্রপ্রধানদের সমতুল্য রাষ্ট্রীয় প্রোটোকল দেওয়া হয়। সৌদি বাদশা জিয়াকে দেখে জড়িয়ে ধরেন এবং তাকে “আমার ভাই” বলে সম্বোধন করেন। তিনি বলেন, “আমার চেক বই প্রস্তুত। বলুন, বাংলাদেশে আমার ভাইদের জন্য কি করতে পারি?”
এই বৈঠকের পরে সৌদি সরকার এককালীন সর্বোচ্চ সাহায্য সহায়তা বাংলাদেশকে দেয়। ২১ কোটি ৭০ লক্ষ মার্কিন ডলারের একটি প্যাকেজে তারা নগদ ছাড় করে ৫ কোটি ডলার।
মিশরের প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাতের সাথে জিয়াউর রহমানের প্রথম বৈঠক খুব একটা সুখকর ছিল না। কারণ শেখ মুজিব হ*ত্যা*কা*ণ্ডে মিশরের উপহার হিসেবে পাঠানোর ট্যাং-কগুলো ব্যবহৃত হয়েছিল।
কিন্তু পরবর্তীতে জিয়ার সাথে সাদাতের সম্পর্ক গভীর বন্ধুত্বে রূপ নেয়। সেই সম্পর্ক থেকে আনোয়ার সাদাত মিশরের সর্বোচ্চ খেতাব “অর্ডার অব দ্য নাইল”-এ জিয়াকে ভূষিত করেন।
এই খেতাবকে বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধানদের প্রতি বন্ধুত্বের অনন্যসাধারণ নিদর্শন হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
১৯৭৭ সালের জিয়া দ্বিতীয়বারের মতো সৌদি আরব ভিজিটে যান এবং এই ভিজিটেই তিনি নিশ্চিত করেন সৌদিতে বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানি। ১৯৭৮ সালের জিয়াউর রহমান আরব আমিরাত ভিজিটে যান। এই সফরে তিনি আরব আমিরাতে বাংলাদেশের শ্রমবাজার উন্মুক্তকরনের ব্যবস্থা করেন।
জিয়ার প্রতি চীনের অকুণ্ঠ সমর্থনে উত্তর কোরিয়া বেশ প্রভাবিত হয়। সে সময় উত্তর কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট কিম ইল সুং তার দেশের ৩০তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে জিয়াকে প্রধান অতিথি করে বিরল সম্মানে ভূষিত করেন। আমেরিকার আপত্তি সত্ত্বেও জিয়া সেই অনুষ্ঠানে অংশ নেন।
যুগোস্লাভিয়ার প্রেসিডেন্ট মার্শাল টিটোর বয়স তখন ৮৪ আর জিয়ার বয়স তার অর্ধেক। অথচ মার্শাল টিটো জিয়াকে অত্যন্ত পছন্দ করতেন। জিয়া একমাত্র বাংলাদেশি যাকে তিনি যুগোস্লাভিয়ার সর্বোচ্চ বেসামরিক খেতাব “যুগস্লাভ বিগ স্টার”-এ ভূষিত করেন।
১৯৮০ সালে জিয়া আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের সাথে সাক্ষাত করেন। তার জন্য বরাদ্দকৃত সময় ছিল মাত্র ১০ মিনিট। কিন্তু কার্টার জিয়ার সাথে কথা বলেন ২৫ মিনিট। মিটিং শেষে আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. ব্রেজেনস্কি বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত তবারক হোসেনকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র তৃতীয় বিশ্বের যে ৫ নেতায় সবচেয়ে বেশি গুনমুগ্ধ প্রেসিডেন্ট জিয়া তাদের মধ্যে একজন। বাকিদের মধ্যে আছেন মিশরের আনোয়ার সাদাত, তানজানিয়ার নায়ারেরে, জর্ডানের বাদশাহ হোসেন এবং আর এক দেশের রাষ্ট্রপ্রধান।
মুসলিম বিশ্বে জিয়াউর রহমানের গ্রহণযোগ্যতা এমন ছিল যে ইরাক-ইরান যু*দ্ধ বন্ধের জন্য ওআইসি একটি পিস কমিটি গঠন করে। যার প্রধান করা হয় প্রেসিডেন্ট জিয়াকে। কারণ তিনি ছিলেন ইরাক-ইরান উভয় দেশের কাছেই গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি।
এ উপলক্ষে জিয়া ১২ই মে ১৯৮১ ইরাক ভিজিটে যান এবং ১৩ই মে তেহেরান যান। উভয় দেশই জিয়াকে সর্বোচ্চ সম্মাননা জানায়। তারা জিয়ার প্রস্তাবগুলো প্রাথমিকভাবে মেনে নেন। কিন্তু ৩০ মে ১৯৮১ জিয়াউর রহমানের মৃ-ত্যু-র মধ্য দিয়ে সেই শান্তি প্রক্রিয়া থেমে যায়। যার পরিণতি ৮ বছরের র/ক্ত/ক্ষ/য়ী যু*দ্ধ
জিয়াউর রহমানের হ/ত্যা/র মাধ্যমে বাংলাদেশ শুধু একজন রাষ্ট্রপ্রধানই হারায়নি বরং পুরো বিশ্ব হারিয়েছে একজন আন্তর্জাতিক পর্যায়ের নেতৃত্ব।
পররাষ্ট্র নীতিতেই ফেরত যেতে চান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান
























